৮০০ বছর বেঁচে থাকা গাছটি কেন হঠাৎ মারা গেল?
ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক শেরউড অরণ্যের অন্যতম পরিচিত প্রতীক ছিল ‘মেজর ওক’ নামের এক বিশাল ওক গাছ। ধারণা করা হয়, এর বয়স ছিল অন্তত ৮০০ বছর, আর কিছু গবেষকের মতে তা ১,২০০ বছরের কাছাকাছি। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৃক্ষ সম্প্রতি চিরতরে প্রাণ হারিয়েছে।
ব্রিটেনের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা আরএসপিবি জানিয়েছে, চলতি বছরের বসন্তে গাছটিতে আর নতুন কোনো পাতা বা কুঁড়ি দেখা যায়নি। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হন যে বহু শতাব্দী ধরে বেঁচে থাকা গাছটির জীবনাবসান ঘটেছে।
কিংবদন্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বৃক্ষ
শেরউড ফরেস্টের এই গাছকে ঘিরে বহু গল্প ও লোককথা প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় বিশ্বাস হলো, ইংরেজ লোককাহিনির নায়ক রবিন হুড নাকি একসময় এই গাছের ফাঁপা কাণ্ডে আশ্রয় নিতেন। যদিও এর ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণিত নয়, তবুও এই গল্পই গাছটিকে বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল।
‘মেজর ওক’ নামটির উৎপত্তিও বেশ আকর্ষণীয়। আঠারো শতকে মেজর হেইম্যান রুক নামে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা গাছটির বর্ণনা ও চিত্র সংরক্ষণ করেন। পরে তাঁর নাম অনুসারেই গাছটি পরিচিতি পায়।
পর্যটকদের ভালোবাসাই হয়ে উঠল বিপদের কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছটির মৃত্যুর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং বহু বছরের নানা ঘটনা মিলেই এর স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে দেয়।
বহু দশক ধরে লাখো দর্শনার্থী গাছটির চারপাশে ঘোরাফেরা করায় মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়ে যায়। মাটি এতটাই শক্ত হয়ে পড়ে যে শিকড় প্রয়োজনীয় পানি ও পুষ্টি সংগ্রহে বাধার মুখে পড়ে। বৃক্ষবিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই সংকুচিত মাটি ধীরে ধীরে গাছটির জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছিল।
বাঁচানোর চেষ্টাও সবসময় সুফল দেয়নি
বিভিন্ন সময়ে গাছটিকে রক্ষার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ঢেকে দেওয়া, ভারী ডালপালা ধরে রাখতে ধাতব কাঠামো বসানো এবং চারপাশে সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, কিছু ব্যবস্থাই উল্টো সমস্যার সৃষ্টি করছে। ধাতব সহায়ক কাঠামো গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। আবার মাটির ক্ষয় রোধে ব্যবহৃত কিছু উপাদান পরবর্তীতে ছত্রাকের বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
শেষ মুহূর্তের পর্যবেক্ষণ
গত কয়েক বছরে গাছটির শারীরিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে এর বৃদ্ধির গতি ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমও পরিমাপ করা হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে জীবনশক্তি কমে আসার লক্ষণ স্পষ্ট হতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত বসন্তে নতুন কোনো পাতা না গজানোয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে, শতাব্দীপ্রাচীন এই বৃক্ষ আর পুনরুজ্জীবিত হবে না।
মৃত্যুর পরও রয়ে যাবে উত্তরাধিকার
যদিও মেজর ওক আর জীবিত নেই, তবুও তার উত্তরাধিকার শেষ হয়ে যায়নি। বছরের পর বছর ধরে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য বীজ থেকে নতুন নতুন ওক গাছ জন্ম নিয়েছে ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থানে।
প্রকৃতিবিদদের মতে, সেই চারাগুলোর মধ্যেই বেঁচে থাকবে শেরউডের এই কিংবদন্তি বৃক্ষের উত্তরসূরি। আর রবিন হুডের গল্প, ইতিহাস ও প্রকৃতির স্মারক হিসেবে ‘মেজর ওক’ মানুষের স্মৃতিতে বহুদিন ধরে স্থান করে নেবে।
প্রতি / এডি / শাআ













